ডেস্ক রিপোর্ট | মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | 15 বার পঠিত

চীনে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়ার মধ্যেই ভারতের বাজারে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে জাপানি কোম্পানিগুলো। ভোক্তা পণ্য, খুচরা ব্যবসা, ব্যাংকিং, প্রযুক্তি ও উৎপাদন—বিভিন্ন খাতে ভারতের বাজারে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল সম্প্রতি জাপান সফরে দেশটির সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরদার করাই ছিল এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
ভারতের মুম্বাই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর শপিংমল ও প্রধান সড়কে জাপানি ব্র্যান্ডের উপস্থিতিও এখন বেশ দৃশ্যমান। পোশাকের ব্র্যান্ড ইউনিক্লো ও মুজি এবং স্নিকার্স নির্মাতা অনিতসুকা টাইগার দেশটিতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে।
জাপানের আসবাব নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিটোরিও সম্প্রতি ভারতের বাজারে প্রবেশ করেছে। পাশাপাশি কনভেনিয়েন্স স্টোর চেইন লসনও ভারতে ব্যবসা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে দেশটিতে ১০ হাজার দোকান খোলার পরিকল্পনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মুম্বাই থেকে এ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা।
ব্যাংকিং ও প্রযুক্তিতেও জাপানের আগ্রহ
শুধু খুচরা ব্যবসা নয়, ভারতের আর্থিক খাতেও জাপানি বিনিয়োগ বাড়ছে। বিদেশি ঋণদাতাদের একটি অংশ যখন ভারতের ব্যাংকিং খাতের বিনিয়োগ থেকে সরে যাচ্ছে, তখন জাপানি ব্যাংকগুলো দেশটির আর্থিক সম্পদ কিনতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
জাপানের বৃহত্তম ব্যাংক এমইউএফজি গত বছর ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে শ্রীরাম ফাইন্যান্সের ২০ শতাংশ শেয়ার কিনেছে। এটি ভারতের আর্থিক খাতে অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগ। একই বছর সুমিতোমো মিৎসুই ব্যাংকিং করপোরেশন ইয়েস ব্যাংকের ২৪ দশমিক ২২ শতাংশ শেয়ার কিনে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডারে পরিণত হয়।
ভারতে জাপানি কোম্পানিগুলোর গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার বা জিসিসি কার্যক্রমও বাড়ছে। ডেলয়েটের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে শতাধিক জাপানি প্রতিষ্ঠান এসব কেন্দ্র পরিচালনা করছে। গবেষণা ও উন্নয়ন, করপোরেট কৌশল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালিত হচ্ছে এসব কেন্দ্রে।
নেক্সট ভারত ভেঞ্চার্সের প্রতিষ্ঠাতা ভিপুল নাথ জিন্দালের মতে, প্রবৃদ্ধির জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোকে এখন ভারতের দিকে তাকাতে হচ্ছে। কারণ, জাপানের জনসংখ্যা গত ১৬-১৭ বছর ধরে কমছে। এতে দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদা যেমন কমছে, তেমনি বাজারের আকারও সংকুচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে জাপানের প্রচলিত ব্যবসায়িক বাজারগুলোর আকর্ষণও কমছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে চীনে বিনিয়োগের ঝুঁকি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক ও তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর বাজার আবার তুলনামূলক ছোট।
সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য ভারতের বিশাল বাজারকে জাপানি কোম্পানিগুলোর কাছে স্বাভাবিক গন্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১২৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের ঘোষণা
ভারত ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরালো হয় প্রায় দেড় দশক আগে বাণিজ্য উদারীকরণের একটি চুক্তির মাধ্যমে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বে উন্নীত হয়। একই সময়ে ভারতে জাপানি কোম্পানির সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয় এবং মুম্বাই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে জাপানের বেসরকারি কোম্পানিগুলো।
জুলাইয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রথম দিল্লি সফরের সময় আয়োজিত এক সম্মেলনে জাপানি কোম্পানিগুলো প্রায় ১২০টি চুক্তির মাধ্যমে ভারতে ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। এসব বিনিয়োগের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর ও সবুজ জ্বালানি খাতও রয়েছে।
ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল জানিয়েছেন, জাপানের ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের আগেই পূরণ হতে পারে।
বড় কোম্পানির পাশাপাশি জাপানের ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোও ভারতের বাজারে প্রবেশের সুযোগ খুঁজছে। সুজুকি, হোন্ডা ও ইয়ামাহার মতো প্রতিষ্ঠানের জন্মস্থান হামামাতসু শহরে সম্প্রতি ‘হামামাতসু ইন্ডিয়া কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। শহরটির ছোট কোম্পানিগুলো কীভাবে ভারতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে, তা নিয়ে কাজ করবে এই কমিটি।
চীন ছাড়ছে না, ঝুঁকি কমাচ্ছে জাপান
ভারতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ার বিপরীতে চীনে জাপানের নিট বিনিয়োগ কমেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর অর্থ এই নয় যে জাপানি কোম্পানিগুলো ব্যাপকভাবে চীন ছেড়ে যাচ্ছে। বরং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পর তারা বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে চাইছে।
সিডনিভিত্তিক লোয়ি ইনস্টিটিউটের ইন্ডিয়া চেয়ার শ্রুতি পান্ডালাইয়ের মতে, চীনসংক্রান্ত ঝুঁকির বিরুদ্ধে ভারত জাপানের জন্য এক ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভারতের উৎপাদন খাত সম্প্রসারণের লক্ষ্যও দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করছে।
তবে ভারত-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার পথে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চীনের উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে জাপানি কোম্পানিগুলোর গভীর সম্পর্ক থাকায় সেখান থেকে পুরোপুরি সরে আসার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাণিজ্যিক খরচ এবং চীনের পাল্টা অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ঝুঁকি রয়েছে।
ভারতেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসা পরিচালনায় করসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জমি ও পরিবেশগত অনুমোদনে বিলম্বের মতো সমস্যা রয়েছে।
সম্প্রতি জাপানের এক সাবেক মন্ত্রী বুলেট ট্রেন প্রকল্পে বিলম্বের জন্য ভারতকে দায়ী করে দিল্লির সরকারের সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ভারত নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিশ্রুতি পরিবর্তন করেছে। ভারত সরকার অবশ্য ওই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে।
ঘটনাটি চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পায়। ভারত-জাপানের মধ্যে মতপার্থক্যের উদাহরণ হিসেবে বিষয়টি তুলে ধরে ভারতের চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে তারা।
তবে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও জাপানি বিনিয়োগের গতি ধরে রাখতে পারলে ভারতের অর্থনীতি আরও লাভবান হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জাপানি বিনিয়োগ ধরে রাখতে ব্যবসার পরিবেশ আরও সহজ ও স্থিতিশীল করা এখন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: বিবিসি
Posted ৮:২৭ এএম | মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Dulal
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।